শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৯:১৫ পিএম, ২০২৬-০৫-২৩
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়—এটি একটি সমাজের বিবেকের পরীক্ষা। যখন কোনো শিশুর নিঃশব্দ কান্না আর্তনাদ হয়ে রাষ্ট্রের দরজায় ধাক্কা দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ সমাজে বাস করছি? নাকি নিরাপত্তার আড়ালে প্রতিদিন আরও ভেঙে পড়ছে আমাদের বিশ্বাস, মানবতা আর দায়িত্ববোধ?
২০২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের একটি আবাসিক এলাকায় রামিসা নামে এক শিশুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনা দেশজুড়ে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচিত পরিবেশেই শিশুটি নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। পরে মরদেহ গুমের চেষ্টা করা হয় বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। স্থানীয়দের হস্তক্ষেপ ও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর ফাটলকে উন্মোচন করেছে।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, সকালে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনায় শিশুটি এমন এক পরিবেশে আক্রান্ত হয়, যেটিকে নিরাপদ বলেই ধরা হয়েছিল। কিন্তু সেই “নিরাপত্তার জায়গা”ই যখন বিভীষিকায় পরিণত হয়, তখন বাবা-মায়েরা নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে যখন অভিযুক্তদের একজন নিজেও সন্তানের পিতা—তখন প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়: মানুষ কি সত্যিই তার নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলছে?
এই ধরনের ঘটনা সমাজে শুধু শোক নয়, এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তাও তৈরি করে। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে—অপরাধের বর্ণনা দিতে গিয়ে যেন আমরা ভুক্তভোগীর প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে না ফেলি। অতিরঞ্জিত বা গ্রাফিক উপস্থাপন অনেক সময় ভুক্তভোগীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং সমাজে অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে হবে শক্তিশালী, কিন্তু ভাষা হতে হবে মানবিক ও দায়িত্বশীল।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো—শিশুরা অধিকাংশ সময় ঝুঁকিতে থাকে পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষের কাছেই। প্রতিবেশী, আত্মীয় বা পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—এসব জায়গাতেই অনেক সময় বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অপরাধ সংঘটিত হয়। ফলে সমাজে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে—বিশ্বাস রাখব, নাকি সতর্ক থাকব? বাস্তবতা হলো, বিশ্বাসের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন সচেতনতা ও সীমানা নির্ধারণ।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করে, আর ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়। কিন্তু যখন একটি শিশু রাষ্ট্রের ভেতরেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, তখন শুধু আইন নয়—রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও শিশুর নিরাপত্তা একটি মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুদের সুরক্ষা, বিকাশ ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার স্পষ্টভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ এই সনদের অংশীদার হলেও বাস্তবতায় বারবার শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রয়োগ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
গণতন্ত্রের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্নের উত্তর। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়, যখন শিশুর হাসিও সেখানে নিরাপদ থাকে। কারণ সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকদের প্রতি আচরণ।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো একসময় পারস্পরিক আস্থা ও সহমর্মিতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধপ্রবণতা, মাদক, সহিংসতা ও নৈতিক অবক্ষয় সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে পরিবারের ভেতরে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইন তৈরি করা নয়, বরং তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো অপরাধে দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। একই সঙ্গে অপরাধীদের পুনর্বাসন ও নজরদারির ব্যবস্থা না থাকলে পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কী পরিবেশে রয়েছে—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিশুদের বয়স উপযোগীভাবে “ভালো স্পর্শ” ও “খারাপ স্পর্শ” সম্পর্কে সচেতন করা, এবং যেকোনো ভয় বা অস্বস্তি সহজে জানানোর পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সমাজকে বুঝতে হবে—শিশু সুরক্ষা কোনো ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। একটি শিশু হারিয়ে গেলে শুধু একটি পরিবার ভাঙে না, একটি ভবিষ্যৎও অন্ধকার হয়ে যায়। তাই এই ধরনের ঘটনার পর ক্ষণিকের ক্ষোভ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, শক্তিশালী আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক জাগরণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এমন সমাজ গড়তে পেরেছি, যেখানে একটি শিশুও ভয় ছাড়া বাঁচতে পারে? যদি না পারি, তবে প্রতিটি নতুন রামিসা আমাদের সামনে শুধু শোক নয়, একটি ব্যর্থতার আয়না হয়ে ফিরে আসবে—যেখানে প্রতিফলিত হবে আমাদেরই নীরবতা, উদাসীনতা আর অসমাপ্ত দায়িত্ববোধ।
লেখক: মহাসচিব, ট্রাস্ট অব হিউম্যান রাইটস্ বাংলাদেশ।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : রাতের নীরবতায় একটি মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল বাবার কাছে পাঠানো মেয়ের শেষ আকুতি। নিজের অবস্থান...বিস্তারিত
আ.ন.ম. তাজওয়ার আলম : দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি - সবাই হঠাৎ সরকারপন্থী জাতীয়তাবাদà...বিস্তারিত
মামুনুর রশিদ সেলিম : চট্টগ্রামে উদ্যোক্তাদের নিয়ে নেক্সট লিডার্সের ‘ফাউন্ডার্স গেট-টুগেদার অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং সে...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফেসবুকের দেয়ালে হঠাৎ একটি ছবি ভেসে ওঠে। পরিচিত কোনো মুখ—কখনো মঞ্চে, কখনো সভায়, কখনো কোনো অনুষ্ঠাà¦...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ক্ষমতার আলো যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি তার ছায়াও দীর্ঘস্থায়ী হয়। ইতিহাসের প্রতিটি রাজনৈতিক পা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কোনো শিরোনামে ধরা পড়ে না, কোনো আলোচনায় দীর্ঘ হয় না; তবুও তাঁদের নীরব উপà¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited